নিপাহ ভাইরাস: সংক্রমণের কারণ ও প্রতিকার
একটি মারাত্মক জুনোটিক ভাইরাস সম্পর্কে সম্পূর্ণ গাইডলাইন - লক্ষণ, প্রতিরোধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি
নিপাহ ভাইরাস কি?
নিপাহ ভাইরাস (NiV) একটি জুনোটিক ভাইরাস যা প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়। এই ভাইরাসটি প্রথমে ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার নিপাহ গাঁওয়ে শনাক্ত হয়, যেখান থেকে এর নামকরণ করা হয়েছে। এটি হেনিপাভাইরাস গণভুক্ত একটি বিপজ্জনক ভাইরাস যা মানুষের মধ্যে মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) এবং শ্বাসযন্ত্রের সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের মৃত্যুর হার ৪০% থেকে ৭৫% পর্যন্ত হতে পারে, যা এটিকে একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক রোগে পরিণত করেছে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের কিছু অঞ্চলে প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে।
নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের কারণ
নিপাহ ভাইরাস প্রধানত প্রাকৃতিকভাবে বাদুড় (বিশেষত ফলখেকো বাদুড়) এর দেহে বসবাস করে। নিম্নলিখিত উপায়ে এটি মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে:
- দূষিত খাদ্য গ্রহণ: বাদুড় দ্বারা আংশিক খাওয়া বা দূষিত ফল, বিশেষ করে খেজুরের রস খাওয়ার মাধ্যমে
- সংক্রামিত প্রাণীর সংস্পর্শ: সংক্রামিত শূকর বা অন্যান্য প্রাণীর সরাসরি সংস্পর্শে আসলে
- মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ: সংক্রামিত ব্যক্তির শ্বাসতন্ত্রের স্রাব বা শারীরিক তরলের মাধ্যমে সরাসরি সংস্পর্শে
- দূষিত পরিবেশ: বাদুড়ের মূত্র বা লালা দ্বারা দূষিত জায়গায় বসবাস বা কাজ করা
- স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সংক্রমণ: অসুস্থ রোগীর যত্ন নেওয়ার সময় উপযুক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা না নিলে
ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী
যারা নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে আছেন:
| ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী | ঝুঁকির কারণ |
|---|---|
| খেজুরের রস সংগ্রহকারী ও বিক্রেতা | বাদুড় দ্বারা দূষিত খেজুরের রসের সংস্পর্শ |
| ফল চাষী ও বিক্রেতা | বাদুড় দ্বারা কাটা বা দূষিত ফলের সংস্পর্শ |
| প্রাণী পালনকারী (বিশেষত শূকর খামারি) | সংক্রামিত প্রাণীর সরাসরি সংস্পর্শ |
| স্বাস্থ্যসেবা কর্মী | সংক্রামিত রোগীর যত্ন নেওয়ার সময় |
| সংক্রামিত ব্যক্তির পরিবার ও পরিচর্যাকারী | ঘনিষ্ঠ শারীরিক সংস্পর্শের মাধ্যমে |
নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ ও উপসর্গ
সংক্রমণের পর সাধারণত ৫-১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দেয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি ৪৫ দিন পর্যন্ত ইনকিউবেশন পিরিয়ড থাকতে পারে।
প্রাথমিক লক্ষণ:
- জ্বর ও মাথাব্যথা
- শ্বাসকষ্ট, কাশি ও গলা ব্যথা
- মাংসপেশিতে ব্যথা ও ক্লান্তি
- বমি বমি ভাব ও বমি
গুরুতর লক্ষণ:
- মানসিক বিভ্রান্তি ও দিকভ্রষ্টতা
- খিঁচুনি ও মস্তিষ্কের প্রদাহ (এনসেফালাইটিস)
- কোমায় চলে যাওয়া
- শ্বাসযন্ত্রের তীব্র সমস্যা
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
উপরের কোন লক্ষণ দেখা দিলে, বিশেষ করে যদি আপনি এমন এলাকায় থাকেন যেখানে নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব আছে, বা আপনি ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত থাকেন, তবে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। প্রাথমিক চিকিৎসা জীবন বাঁচাতে পারে।
প্রতিকার ও চিকিৎসা পদ্ধতি
বর্তমানে নিপাহ ভাইরাসের কোন নির্দিষ্ট ভ্যাকসিন বা চিকিৎসা নেই। চিকিৎসা মূলত লক্ষণভিত্তিক এবং সহায়ক পরিচর্যার উপর নির্ভরশীল।
চিকিৎসা পদ্ধতি:
- হাসপাতালে ভর্তি: তীব্র লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে
- শ্বাসপ্রশ্বাস সহায়তা: শ্বাসকষ্টের ক্ষেত্রে শ্বাসযন্ত্রের সহায়তা প্রয়োজন
- লক্ষণভিত্তিক ওষুধ: জ্বর, ব্যথা ও খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণের জন্য ওষুধ
- নিবিড় পরিচর্যা: কোমায় চলে গেলে নিবিড় পরিচর্যা ইউনিটে রাখা
- অ্যান্টিভাইরাল থেরাপি: কিছু ক্ষেত্রে রিবাভিরিন নামক অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ ব্যবহার করা হয়
নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধের উপায়:
প্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলুন
বাদুড় ও শূকর থেকে দূরত্ব বজায় রাখুন। মৃত বা অসুস্থ প্রাণী স্পর্শ করবেন না।
ফল ভালোভাবে ধুয়ে খান
বাদুড়ের কামড়ের চিহ্ন আছে এমন ফল খাবেন না। সব ফল খাওয়ার আগে ভালোভাবে ধুয়ে নিন।
ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা
নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে, বিশেষ করে খাওয়ার আগে ও প্রাণী স্পর্শ করার পর।
সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন
নিপাহ ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে কমপক্ষে ২১ দিন নিজেকে পর্যবেক্ষণে রাখুন।
সুরক্ষামূলক পোশাক
প্রাণীর যত্ন নেওয়া বা রোগীর সেবা করার সময় মাস্ক, গ্লাভস ও গাউন ব্যবহার করুন।
খেজুরের কাঁচা রস এড়িয়ে চলুন
বাদুড় দ্বারা দূষিত হতে পারে এমন কাঁচা খেজুরের রস বা তার তৈরি পণ্য গ্রহণ করবেন না।
সচেতনতা হচ্ছে সর্বোত্তম প্রতিরোধ
নিপাহ ভাইরাস সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করে এবং উপযুক্ত সতর্কতা অবলম্বন করে আমরা এর সংক্রমণ রোধ করতে পারি। এই তথ্যগুলো আপনার পরিবার ও বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন।
